তবুও নাম তার সুখী বেগম!
স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় :
০৯-০৪-২০২৬ ০৬:৩৬:৩৪ অপরাহ্ন
আপডেট সময় :
০৯-০৪-২০২৬ ০৬:৩৬:৩৪ অপরাহ্ন
২০০৯ সালে সুখী বেগম (বামে), ২০২৬ সালে সুখী বেগম (ডানে)। ছবি: বাংলাস্কুপ
স্রোতে ভাসা দলছুট কচুরিপানার মতো ভাসতে ভাসতে সুখী বেগমের এখন ঠাঁই হয়েছে কলাপাড়ার মহল্লাপাড়া গ্রামে। ছিলেন রাবনাবাদ পাড়ের ভাঙ্গা বাঁধের স্লোপে, চৌধুরীপাড়ায়। নেই গ্রামটির জনপদ। সব গিলে খেয়েছে রাবনাবাদ নদী। এখন রাবনাবাদপাড়ে সরকারের যতোসব উন্নয়ন চলছে। হয়েছে পায়রা সমুদ্র বন্দর নির্মাণ। প্রস্তুত ফার্স্ট টার্মিনাল। কিন্তু সুখী বেগম কোন কূল-কিনার পায়নি। পারেনি কোমর সোজা করে দাঁড়াতে।
হঠাৎ খুঁজে পাওয়া। ১৫ বছর পরে ফের দেখা সুখী বেগমের সঙ্গে। তবে সুখ যেন তার জীবনে অধরাই থেকে গেল। শরীরে নেই চলৎশক্তি।
জানালেন, রাবনাবাদ পাড়ের শেষ জমিটুকুন সিডরের তাণ্ডবে ঘরসহ বিলীন হয়েছে। আশ্রয় নিয়েছিলেন ভাঙা বাঁধের স্লোপের একটি ঝুপড়িতে। তাও আরেক জলোচ্ছ্বাস আইলা বিধ্বস্ত করে দেয়। তখনকার দুরবস্থায় থাকা সুখী বেগমের জীবনচিত্র উঠে আসে গণমাধ্যমে। বিধ্বস্ত বাঁধের স্লোপে চরের শাক রান্না করছিলেন। অন্যের দেয়া অন্নের যোগানে চলছিল দুপুরের খাবারের প্রস্তুতি। এর পরে আর দেখা মেলেনি এই মানুষটির।
১৫ বছর পরে ফের হঠাৎ দেখা মেলে সুখীর সঙ্গে। কথা হয় বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) বিকেলে। এরই মধ্যে এক যুগেরও বেশি সময়ের ব্যবধানে পাল্টেছে পটুয়াখালীর কলাপাড়ার লালুয়ায় গোটা জনপদ। পথঘাট, প্রশস্ত পাকা সড়ক হয়েছে অনেকটা। বিদ্যুতের আলো পৌছেছে ঘরে ঘরে। পায়রা পোর্টের প্রথম টার্মিনালের কাজ শেষ হয়েছে। চলছে উদ্বোধনের প্রস্তুতি। চলছে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড। তেমনি সুখী বেগমের ভাগ্যকাশও পাল্টেছে। তবে ভিন্ন আঙ্গিকে। তিন দফা বাড়িঘর পাল্টে সুখী বেগমের পাঁচজনের সংসারে আরও এক কন্যা মিথিলা এসেছে। এখন সে দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী। স্কুলের মাসিক এক হাজার টাকা খরচের যোগান দিতে না পারায় মাদ্রাসায় ভর্তি করেছেন। আর একমাত্র ছেলে সুহাদ বিয়ে করেছেন। নাতিও এসেছে ছেলে বউর কোলজুড়ে। কিন্তু তিন বছর বয়সী নাতি অনেক অসুস্থ। শ্বাসকষ্টে ভুগছে। খিচুনি দেয়। এনিয়ে অজানা শঙ্কায় প্রতিটি মুহূর্ত কাটছে সুখী বেগমের। তার উন্নতি যা এইটুকু।
সংসারের মানুষ বেড়েছে। বাড়েনি স্বামী দুলাল গাজীর আয়। রাবনাবাদ পাড় থেকে প্রায় চার কিলোমিটার দুরে মহল্লাপাড়ায় এক চিলতে জমিতে বাড়ি করেছেন। জানালেন, গৃহহীন হয়ে ঢাকায় গিয়ে ইট-পাথর ভাঙ্গার কাজ করেছেন। রক্ত পানি করা সংগৃহীত টাকায় এই জমিটুকুন কিনেছেন। একটি ঘর করেছেন। তাও এখন জীর্ণদশায়। বৃষ্টি হলেই পানি পড়ে। মেরামত প্রয়োজন। কিন্তু সঙ্গতি নেই। স্বামীর রাবনাবাদে মাছ ধরার আয়ও নেই বললেই চলে। জানালেন, মাছ মেলে না। এবছর বিশেষ ভিজিএফএর চাল পেয়েছেন, ৬০ কেজি।
সুখী বেগমের জীবন-সংসারের শ্রী বাড়েনি। তেমনি মেলেনি আর্থিক নিরাপত্তা। কিন্তু দৈন্য বেড়েছে। সংসারের হাল বইয়ে চলা এই গৃহিনী জীবনের সুখ কী বোঝেননি। প্রায় ৩৩ বছরের সংসার জীবনের কোন হিসাব মেলাতে পারছেন না। এখন সুখী বেগম প্রায় অচল। তবে বয়সের ভারে নয়। অসুখে। চিকিৎসার যোগানও ঠিকঠাক চলছে না। জানালেন, দুইবার স্ট্রোকের পরে এমন দুরবস্থায় পড়েছেন। ‘৭৯ সালে জন্ম নেয়া গ্রামীণ এই নারীর ৪৭ বছরেই চলনশক্তি নেই। তার শঙ্কা, জীবনশক্তিও যেন হারাতে চলেছেন। পড়ে আছেন ঘরে। স্বামী-সন্তানদের ধরা হাতের সহায়তায় উঠে বসতে, চলতে হয়। জানালেন, কিডনিতেও সমস্যা রয়েছে। সপ্তাহে এক হাজার টাকার ওষুধ কিনতে হয়। বললেন, হতাশা আর না পাওয়ার অনেক কথা। তা যেন সুখীর দুঃখের সাতকাহন।
স্বামী দুলাল গাজী জানান, ভাগে ট্রলারের কাজে ছিলেন। লোকসান বাদ দিয়ে প্রায় আড়াই লাখ টাকার ধার-দেনায় ছেলেকে নিয়ে ছোট্ট ইঞ্জিনচালিত নৌকায় এখনও সাগরে ছোটেন। আগে রাবনাবাদে মাছ ধরতেন। পোর্ট হওয়ায় রাবনাবাদ চ্যনেল থেকে দূরে, সাগর মোহনায় যেতে হয়। এখন আর ইলিশ নেই। দুই-চার কেজি পোয়া মাছ পেলে তাই ভরসা। স্ত্রীর অসুখে অন্তত তিন লাখ টাকার ধার-দেনায় কাহিল। বাবার জমি-জিরেত আরও এক যুগ আগে রাবনাবাদ নদী গিলে খেয়েছে। যদিও বড় মেয়ে লিজা ও মেজ মেয়ে রিণিকে বিয়ে দিয়েছেন। ছেলে সুহাদ গাজীকে নিয়ে সংসারের চাকা ঠেলছেন। কিন্তু গতি নেই। এতোসব অসহায়ত্ব, তার ওপরে ছোট্ট মেয়ে মিথিলার লেখাপড়া, এতোসবের যোগান নিয়ে সুখী বেগমের রাতের ঘুম হারাম হয়ে যায়। তিন বেলা স্বামী-সন্তান, নাতি নিয়ে খাবার যোগাড়ের দুর্ভাবনায় কাটে একেকটি প্রহর।
২০০৯ সালের দেখা সুখী বেগমকে যেন এখন মনে হয় অচেনা। প্রকৃতির রোষানলে পিষ্ট হয়ে চিড়েচ্যাপ্টা অবস্থা হয়েছে। নদী গিলেছে ঘরবাড়িসহ ঠিকানা। নতুন ঠিকানা একটা জুটেছে। কিন্তু এখন শরীর তাকে কোন ভরসা দেয় না চলনে। একটুতেই চোখে সব ঝাপসা দেখেন।
বললেন সুখী বেগম, ‘চুবান খাইছি সিডরে। ভাসছি আইলায়। দেখছি নার্গিস, বিজলীসহ অনেক দূর্যোগ আর বইন্যা। এহন সামনে পথের দিশা পাই না।’
এ নারীর এখন সবচেয়ে বড় দূর্যোগ আর্থিক অনটন। তাহলে অন্তত চিকিৎসাটা করতে পারতেন। এক রাশ হতাশার রাজ্যে সুখীর যেন দুঃখী মুখখানা অনেক প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বেড়ায়। সুখের স্পর্শ পেয়েছেন এমন কোন ক্ষণের কথা জানাতে পারলেন না এই নারী। তবুও নাম তার সুখী বেগম।
বাংলা স্কুপ/প্রতিনিধি/এইচএইচ/এসকে
প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স